টেক্সটাইল কী? টেক্সটাইল সেক্টরের প্রধান ৪টি শাখা সম্পর্কে জানুন

বাংলাদেশে টেক্সটাইল সেক্টর আসলে অনেক বড় সেক্টর। রপ্তানি আয়ের ২য় সর্বচ্চো খাত হলো টেক্সটাইল। আমরা অনেকেই গার্মেন্টস মান বুঝি, একটু টেক্সটাইল বুলতে আসলেই কি বুঝায় সঠিক জানিনা। অনেকে আবার টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শব্দ দুটো বলতেই শুধু বুঝি পোষাক তৈরি।
তাই আমি মুহাম্মদ মুন্না হোসেন, আছি আপনাদের, আজকে অতি সহজ ও সংক্ষেপে টেক্সটাইল বিষয়টা আসকে বুঝিয়ে বলব। চলুন জানি…
টেক্সটাইল আসলে কী?
‘টেক্সটাইল’ (Textile) শব্দটা আমাদের কাছে খুব পরিচিত, কারণ আমরা প্রতিনিয়ত এই শব্দটি ব্যবহার করি। তবে মজার ব্যাপার হলো, এটি একটি ইংরেজি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘বয়ন সংক্রান্ত’ বা সহজ কথায় কাপড় বোনা সম্পর্কিত বিষয়। আমরা অনেকেই মনে করি টেক্সটাইল মানেই শুধু কাপড়, কিন্তু এর পরিধি ও গভীরতা আসলে অনেক বিশাল। বিশেষ করে নিটিং বা ডাইং-এর মতো বিষয়গুলোও যে টেক্সটাইলেরই একটি বড় অংশ, সেটা আমাদের পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।
শব্দটির উৎপত্তি:
‘Textile’ শব্দটির ইতিহাস বেশ পুরনো। এটি মূলত ল্যাটিন শব্দ ‘Textilis’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘কাপড় সংক্রান্ত’। আবার অনেকে বলেন এটি ফরাসি শব্দ ‘Texere’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বোনা’ বা ‘বয়ন করা’।
এক কথায় টেক্সটাইল কী?
মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘বস্ত্র’ বা পোশাক। এই পোশাক তৈরির একদম শুরুর ধাপ অর্থাৎ মাঠ থেকে তুলা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে, সেই তুলা থেকে সুতা বানানো এবং সবশেষে ব্যবহার উপযোগী পোশাক তৈরি পর্যন্ত যতগুলো পদ্ধতি, প্রযুক্তি এবং কৌশল কাজ করে—এই সবকিছুর সম্মিলিত রূপকেই বলা হয় টেক্সটাইল। এর ভেতরে স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং এবং গার্মেন্টস—প্রতিটি সেকশনই একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টেক্সটাইল সেক্টরের ৪টি প্রধান শাখা
পুরো টেক্সটাইল জগতকে মূলত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো-
১. স্পিনিং (সুতা তৈরির প্রক্রিয়া)
২. উইভিং বা নিটিং (কাপড় তৈরির প্রক্রিয়া)
৩. ডাইং ও প্রিন্টিং (কাপড় রাঙানোর প্রক্রিয়া)
৪. গার্মেন্টস (পোশাক তৈরির চূড়ান্ত ধাপ)
নিচে এই চারটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
১. স্পিনিং (Spinning) বা সুতা তৈরি
টেক্সটাইল প্রক্রিয়ার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো স্পিনিং। তবে স্পিনিং মেশিনে যাওয়ার আগে তুলার কিছু প্রাথমিক কাজ থাকে। যেমন, মাঠ থেকে তুলা তোলার পর সেটি সরাসরি সুতা তৈরির উপযোগী থাকে না। ‘জিনিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তুলা থেকে বীজ আলাদা করে সেটিকে পরিষ্কার ও ব্যবহারের যোগ্য করা হয়।
ইংরেজি ‘Spin’ শব্দ থেকে স্পিনিং এসেছে, যার অর্থ হলো ঘোরানো বা পাকানো। এই সেকশনে তুলাকে বিভিন্ন মেশিনের মাধ্যমে পরিষ্কার করে সোজা ও সমান্তরাল করা হয় (যাকে রডিং বলা হয়)। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই তুলাকে টেনে চিকন করা হয় এবং রিং মেশিনের সাহায্যে পাক (Twist) দিয়ে মজবুত সুতা তৈরি করা হয়। এই যে আঁশ থেকে সুতা পাকানোর পুরো প্রক্রিয়া, এটিই হলো স্পিনিং।
২. উইভিং (Weaving) ও নিটিং (Knitting) বা কাপড় বুনন
সুতা তৈরি হয়ে গেলে দ্বিতীয় কাজ হলো সেই সুতা দিয়ে কাপড় বানানো। এটি মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতিতে করা হয়:
উইভিং (Weaving): এটি হলো তন্তুর বুনন পদ্ধতি। এখানে টানা সুতা এবং পড়ন সুতা ব্যবহার করে মাকু ও মাকুর সাহায্যে কাপড় বোনা হয়। আমরা যে গামছা, শাড়ি, লুঙ্গি বা চাদর ব্যবহার করি, সেগুলো সাধারণত এই উইভিং পদ্ধতিতেই তৈরি। উইভিং মেশিনে তৈরি কাপড়কে বলা হয় ‘ওভেন ফ্যাব্রিক’। আর এই কাপড় তৈরির যন্ত্রকে আমরা বাংলায় বলি ‘তাঁত’।
নিটিং (Knitting): নিটিং শব্দটির অর্থও বোনা। তবে এর পদ্ধতি আলাদা। এখানে নিডল বা সুঁইয়ের সাহায্যে সুতা দিয়ে ছোট ছোট ‘লুপ’ তৈরি করে একটির সাথে অন্যটি যুক্ত করে কাপড় বানানো হয়। আমাদের খুব পরিচিত টি-শার্ট, পলো শার্ট বা গেঞ্জি এই নিটিং পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিতে তৈরি কাপড়কে বলা হয় ‘নিট ফ্যাব্রিক’।
অন্যান্য পদ্ধতি:
উইভিং ও নিটিং ছাড়াও আরও দুটি উপায়ে কাপড় তৈরি হয়:
নন-ওভেন (Non-woven): এখানে সুতা না বানিয়ে সরাসরি আঁশগুলোকে আঠা জাতীয় পদার্থ দিয়ে জোড়া লাগিয়ে কাপড় তৈরি করা হয়। এগুলো সাধারণত ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাজে ব্যবহৃত হয়।
ব্রেইডিং (Braiding): কয়েক গাছি সুতাকে একত্রে পাকিয়ে বা জড়িয়ে ফিতা বা দড়ির মতো কাপড় তৈরি করা হয় (যেমন জুতোর ফিতা)।
৩. ডাইং (Dyeing) বা কাপড় রাঙানো
সাদা বা ফ্যাকাশে সুতা বা কাপড়কে বিভিন্ন রঙে রাঙানোর পদ্ধতিই হলো ডাইং। টেক্সটাইল দ্রব্য যেমন আঁশ, সুতা বা তৈরি কাপড়কে আকর্ষণীয় করতে এই ধাপটি অত্যন্ত জরুরি। ‘Dye’ মানে হলো রঞ্জক পদার্থ। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য বা কেমিক্যালের সাহায্যে কাপড়কে রঙের দ্রবণে ডুবিয়ে রঙিন করার প্রক্রিয়াই হলো ডাইং।
ডাইং সাধারণত দুই ধরনের হয়:
ওভেন ডাইং (Woven Dyeing): তাঁতে বোনা বা ওভেন কাপড় রঙ করার প্রক্রিয়া।
নিট ডাইং (Knit Dyeing): গেঞ্জি বা নিট জাতীয় কাপড় রঙ করার প্রক্রিয়া। এই দুই ধরনের কাপড়ের ডাইং পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
৪. গার্মেন্টস (Garments) বা পোশাক তৈরি
অনেকেই ‘গার্মেন্টস’ শব্দটা শুনলেই বড় কোনো কারখানা মনে করেন, কিন্তু আসলে ‘গার্মেন্টস’ মানে হলো পোশাক বা পরিচ্ছদ। আর যেখানে পোশাক তৈরি হয় তাকে বলা হয় ‘গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি’। এটি টেক্সটাইল প্রক্রিয়ার একদম শেষ ধাপ।
এখানে কাপড় আসার পর সেটিকে নির্দিষ্ট ডিজাইন বা মাপ অনুযায়ী কাটা হয় (Cutting), তারপর সেলাই (Sewing) করা হয় এবং বোতাম বা জিপারের মতো বিভিন্ন জিনিস যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ পোশাক তৈরি করা হয়। মনে রাখবেন, ‘ফ্যাব্রিক’ (কাপড়) আর ‘গার্মেন্টস’ (পোশাক) এক জিনিস নয়। কাপড় পরিধানযোগ্য হতেও পারে আবার নাও হতে পারে (যেমন থানের কাপড়), কিন্তু গার্মেন্টস বা পোশাক অবশ্যই পরিধানের উপযোগী।
গার্মেন্টসও দুই প্রকারের হয়-
ওভেন গার্মেন্টস: ওভেন কাপড় দিয়ে বানানো শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ ইত্যাদি।
নিট গার্মেন্টস: নিট কাপড় দিয়ে তৈরি টি-শার্ট, পলো-শার্ট বা সোয়েটার ইত্যাদি।
বন্ধুরা আজকের মত এখানেই ইতি টানছি, আশা করি, টেক্সটাইল বিষয়টা কি পুরো বিষয়টি এখন একদম পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতে পেরেছি। আমাকে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভালো লাগলে ফলো করে সাথেই থাকুন।
–মোঃ মুন্না হোসেন, বগুড়া, বাংলাদেশ





