পৃথিবীটা অন্যায়ে ঘেরা, এর মাঝেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেই জীবন সুন্দর!

এই যে আজকের দুনিয়া—চারপাশে তাকালে কি মনে হয়? সব কিছু কি খুব নিয়ম মেনে চলছে? একদমই না। মাঝেমধ্যে মনে হয় পৃথিবীটা যেন একটা মস্ত বড় ‘অন্যায়ের বাজার’। কেউ খাটাখাটনি করেও ফল পাচ্ছে না, আবার কেউ কিছুই না করে সব বাগিয়ে নিচ্ছে। কেউ অনেক সৎ হয়েও বিপদে পড়ছে, আবার কেউ ধুরন্ধর হয়ে দিব্যি সুখে আছে।
এই যে একটা গুমোট পরিস্থিতি, এটা দেখে আমাদের অনেকেরই মনে হয়—ধুর! এই জীবনে আর কী হবে? কিন্তু সত্যি বলতে কী, পৃথিবীটা এরকমই ছিল, হয়তো এমনই থাকবে। এর মধ্যেই নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে, মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার নামই হলো আসল জীবন।
আমরা ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ে পড়ে এসেছি—”সততাই সর্বোত্তম পন্থা” কিংবা “পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি”। কিন্তু বড় হয়ে যখন বাস্তব জীবনে পা রাখি, তখন দেখি হিসাবটা উল্টো।
- অফিসে দেখলেন আপনার চেয়ে কম কাজ করা কলিগটি বসকে তেল দিয়ে প্রমোশন নিয়ে নিলো।
- সমাজে দেখলেন যে লোকটা মানুষের হক মেরে খাচ্ছে, তাকেই সবাই সম্মান দিচ্ছে।
- এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও দেখলেন, আপনি যার জন্য জানপ্রাণ উজাড় করে দিলেন, সেই আপনাকে সবচেয়ে বড় ধোঁকাটা দিয়ে গেলো।
এইসব দেখে মাথার ভেতর একটা জিদ চেপে বসে। মনে হয়, “আমিও কেন খারাপ হব না?” কিন্তু এখানেই হচ্ছে আসল পরীক্ষা। চারপাশের পচা নর্দমার মাঝেও পদ্মফুল হয়ে ফুটে থাকাটাই কিন্তু চ্যালেঞ্জ।
অনেকে মনে করেন, মানিয়ে নেওয়া মানে হলো অন্যায় সহ্য করা বা মেরুদণ্ডহীন হয়ে থাকা। একদমই না! মানিয়ে নেওয়া মানে হলো আপনার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা মানসিক বুদ্ধিমত্তা।
এর মানে হলো-
১. সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, এটা মেনে নেওয়া: আপনি চাইলেই কাল সকালে সব দুর্নীতি বন্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি নিজে দুর্নীতি করবেন কি না, সেটা আপনার হাতে।
২. মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া: কেউ আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে আপনিও যদি সমানে চিৎকার শুরু করেন, তবে দিনশেষে আপনার ব্লাড প্রেসার বাড়বে, তার কিছু হবে না। এখানে চুপ থেকে নিজের কাজ করে যাওয়াটাই হলো মানিয়ে নেওয়া।
৩. অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়ানো: দুনিয়ায় এমন অনেক মানুষ পাবেন যাদের কাজই হলো আপনাকে খ্যাপানো। তাদের এড়িয়ে চলাটা দুর্বলতা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
আসলে জীবনটা কোনো নিখুঁত ক্যানভাস না। এখানে কালো দাগ থাকবেই। কিন্তু ওই কালো দাগের ফাঁকেই যখন ছোট একটা হাসির মুহূর্ত আসে, সেটাই জীবনকে সুন্দর করে তোলে।
- সারাদিন খাটুনি আর বাইরের মানুষের বাজে ব্যবহার সয়ে বাসায় ফিরে যখন সন্তানের হাসিটা দেখেন, তখন কি মনে হয় না জীবনটা আসলে অতটাও খারাপ না?
- যখন দেখেন এই অন্যায়ের মাঝেও কোনো একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে রাস্তার একটা বিড়ালকে খাওয়াচ্ছে, তখন কি মানবতার ওপর বিশ্বাস ফিরে আসে না?
সৌন্দর্য আসলে আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমরা যদি সারাদিন “আমার সাথে কেন এমন হলো” এই জপ করতে থাকি, তবে সুন্দর জিনিসগুলো আমাদের চোখে পড়বেই না।
১. নিজের ভেতরে একটা ‘ফিল্টার’ বসান: বাইরের সব কথা আর সব ঘটনাকে মনের ভেতরে ঢুকতে দেবেন না। যেটা আপনার উপকারে আসবে না বা আপনার হাতে নেই, সেটাকে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিন।
২. ছোট ছোট প্রাপ্তিতে আনন্দ খুঁজুন: বড় কোনো মিরাকল হবে—এই আশায় বসে থাকবেন না। এক কাপ ভালো চা, বৃষ্টির শব্দ, কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা—এগুলোকেই সেলিব্রেট করতে শিখুন। বিশ্বাস করুন, এতেই হার্ট ভালো থাকে।
৩. প্রত্যাশা কমান: মানুষের ওপর আমরা যত বেশি আশা করি, আঘাত তত বেশি পাই। কাজ করুন নিজের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মানুষ আপনাকে প্রতিদান দেবে না—এটা মাথায় রেখে কাজ করলে ঠকে যাওয়ার ভয় থাকে না।
পৃথিবীটা একটা গোলকধাঁধার মতো। এখানে চড়াই-উতরাই থাকবেই। অন্ধকার ছাড়া যেমন আলোর দাম নেই, তেমনি অন্যায়ের দাপট না থাকলে ন্যায়ের মাহাত্ম্য বোঝা যেত না।
সবকিছুর পরেও জীবনটা অনেক দামী। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যতটুকু শক্তি আছে, ততটুকু করুন। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যেন আপনার ভেতরের মানুষটাকে মেরে না ফেলে। নিজেকে মানিয়ে নিন পরিস্থিতির সাথে, আর মনটাকে রাখুন আকাশের মতো বড়। দেখবেন, এই ভাঙাচোরা পৃথিবীর মাঝেই আপনি এক টুকরো স্বর্গ খুঁজে পেয়েছেন।
–মোঃ মুন্না হোসেন, বগুড়া, বাংলাদেশ

