কেন যে কোনো দেশে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় বিদেশ যাওয়া উচিত নয়?

যেনতেন দেশে ওয়ার্ক পারমিট কাজের ভিসায় বিদেশ যাওয়া উচিত নয়।
আমার হিসেবে যেসকল দেশের মাথাপিছু জিডিপি আয় ১০ হাজার ডলারের কম সেসব দেশে কখনোই ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় যাওয়া যাবে না। কারণ পরিবার দেশ ছেড়ে কট সহ্য করে প্রবাসী যাবার উদ্দেশ্যেই বেশি অর্থ উপার্জন করা। যদি অতি দূর্বল অর্থনীতির দেশ যাওয়া হয় তাহলো যথেষ্ট উপার্জন করা সম্ভব হয়না।
বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন আমাদের দেশের হাজারো তরুণের চোখে। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে এমন সব দেশে পাড়ি জমান, যেখানে গিয়ে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয়।
তাই বিদেশ যাওয়ার আগে সাবধান।
আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে— “যেকোনোভাবে একবার বিদেশ পৌঁছাতে পারলেই হলো।” কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেও তাই? একদমই না। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বিদেশ যাওয়া মানে হলো নিজের এবং নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।
আজকের আমি আলোচনা করব, কেন ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের একটু ‘হিসাবি’ হওয়া প্রয়োজন।
সহজ কথায়, একটি দেশের মাথাপিছু আয় (GDP per Capita) যত বেশি, সেই দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং মজুরি তত বেশি। ১০,০০০ ডলারের নিচে যেসব দেশের মাথাপিছু আয়, সেই দেশগুলোতে কাজের জন্য যাওয়া মানেই হলো বিপদে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করা।
কেন GDP ১০ হাজার ডলারের নিচের দেশে যাবেন না?
* স্বল্প মজুরি: যে দেশের নিজস্ব নাগরিকরাই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে তারা একজন বিদেশি কর্মীকে খুব বেশি বেতন দেবে না।
* মুদ্রার মান: অধিকাংশ নিম্ন জিডিপির দেশের মুদ্রার মান অনেক দুর্বল থাকে। ফলে অনেক খাটাখাটনি করে যা আয় করবেন, তা টাকায় রূপান্তর করলে দেখা যাবে মাস শেষে হাতে কিছুই থাকছে না।
* কাজের পরিবেশ: অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে সাধারণত শ্রম আইন খুব একটা কড়া হয় না। ফলে সেখানে শ্রমিক শোষণের হার বেশি থাকে।
একজন মানুষ যখন দেশ ছাড়ে, সে শুধু একাই যায় না; পেছনে ফেলে যায় বাবা-মায়ের মমতা, স্ত্রীর ভালোবাসা আর সন্তানদের শৈশব। এই যে বিশাল এক মানসিক কষ্ট বা ‘স্যাক্রিফাইস’, এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে— পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনা।
এখন আপনি যদি এমন দেশে গেলেন যেখানে থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে দেশে পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত টাকা হাতে থাকে না, তবে এই ত্যাগের কোনো মূল্য থাকে না। প্রবাসী হওয়ার মূল সার্থকতা তখনই, যখন আপনি নিজের কষ্টের বিনিময়ে দেশে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারবেন।
দালালরা সবসময় বলবে, “ইউরোপের অমুক দেশ” বা “অল্প টাকায় ওই দেশ”। কিন্তু মনে রাখবেন, সব ইউরোপীয় দেশ কিন্তু এক নয়। ইউরোপের এমন অনেক দেশ আছে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের অনেক এশিয় দেশের চেয়েও খারাপ।
যেকোনো দেশে যাওয়ার আগে গুগল করে দেখে নিন সেই দেশের GDP per capita কত। যদি দেখেন সেটা ১০ হাজার ডলারের নিচে, তবে সেখানে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আরেকবার ভাবুন। ১০ হাজার ডলারের ওপরের দেশগুলো (যেমন: মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ধনী দেশ, পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশসমূহ) সাধারণত কাজের জন্য নিরাপদ।
বিদেশ যেতে আমাদের দেশের মানুষদের ভিটেমাটি বা জমি বিক্রি করতে হয়। যদি আপনার যাওয়ার খরচ হয় ৫-৭ লাখ টাকা, আর সেখানে গিয়ে মাসে আপনার সঞ্চয় হয় মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা, তবে সেই টাকা তুলতে আপনার ৩-৪ বছর লেগে যাবে। এরপর লাভ করবেন কবে?
তাই হিসাবটা হতে হবে এমন— যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে ন্যূনতম আয়ের সম্ভাবনা যেন অন্তত এমন হয় যা দিয়ে ২ বছরের মধ্যে যাতায়াত খরচ উঠে আসে।
তাই বলব-
ইমোশন দিয়ে নয়, জীবন চালাতে হয় লজিক বা যুক্তি দিয়ে। বিদেশ যাওয়ার হিড়িক না বাড়িয়ে বরং যেখানে গেলে আপনার কষ্টের দাম পাওয়া যাবে, সেখানেই যাওয়ার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যদি মাস শেষে পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত টাকা না পাঠানো যায়, তবে সেই প্রবাস জীবনের চেয়ে দেশের মাটিতে থেকে ছোটখাটো কিছু করাও অনেক সম্মানের।
সতর্ক হোন, সঠিক দেশ নির্বাচন করুন এবং দালালের খপ্পর থেকে বাঁচুন।
২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুসারে যে সকল দেশের জিডিপি পার ক্যাপিটা দশ হাজার ডলারের চেয়ে বেশি সেগুলো দেশ হলো-
- মোনাকো: ২৫৬,৫৮১ ডলার
- লাইখটেনস্টাইন: ২৩১,৭১৩ ডলার
- লুক্সেমবার্গ: ১৪৬,৮১৮ ডলার
- আয়ারল্যান্ড: ১২৯,১৩২ ডলার
- সুইজারল্যান্ড: ১১১,০৪৭ ডলার
- আইসল্যান্ড: ৯৮,১৫০ ডলার
- সিঙ্গাপুর: ৯৪,৪৮১ ডলার
- নরওয়ে: ৯১,৮৮৪ ডলার
- যুক্তরাষ্ট্র: ৮৯,৫৯৯ ডলার
- ডেনমার্ক: ৭৬,৫৮১ ডলার
- ম্যাকাও: ৭৪,৯২১ ডলার
- নেদারল্যান্ডস: ৭৩,১৭৪ ডলার
- কাতার: ৭১,৪৪১ ডলার
- অস্ট্রেলিয়া: ৬৫,৯৪৬ ডলার
- সান মারিনো: ৬৫,২৬৯ ডলার
- সুইডেন: ৬২,০৩৬ ডলার
- অস্ট্রিয়া: ৬১,৬৯৪ ডলার
- বেলজিয়াম: ৬০,৪১৮ ডলার
- ইসরায়েল: ৬০,০০৯ ডলার
- জার্মানি: ৫৯,৯২৫ ডলার
- হংকং: ৫৬,৮৪৪ ডলার
- যুক্তরাজ্য: ৫৬,৬৬১ ডলার
- ফিনল্যান্ড: ৫৬,০৮৪ ডলার
- কানাডা: ৫৪,৯৩৫ ডলার
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৫১,৩৪৮ ডলার
- অ্যান্ডোরা: ৪৯,৪৫১ ডলার
- নিউজিল্যান্ড: ৪৯,৩৮৩ ডলার
- মাল্টা: ৪৯,২৭৭ ডলার
- ফ্রান্স: ৪৮,৯৮২ ডলার
- ইতালি: ৪৩,১৬১ ডলার
- সাইপ্রাস: ৪২,৪১৩ ডলার
- স্পেন: ৩৮,০৪০ ডলার
- তাইওয়ান: ৩৭,৮২৬ ডলার
- দক্ষিণ কোরিয়া: ৩৫,৯৬২ ডলার
- সৌদি আরব: ৩৫,২৩১ ডলার
- চেক প্রজাতন্ত্র: ৩৫,১৬১ ডলার
- জাপান: ৩৪,৭১৩ ডলার
- পর্তুগাল: ৩১,৪১৫ ডলার
- কুয়েত: ৩০,৮০৫ ডলার
- পোল্যান্ড: ২৮,৪৮৫ ডলার
- গ্রিস: ২৭,১৭০ ডলার
- ক্রোয়েশিয়া: ২৬,৯৫৮ ডলার
- হাঙ্গেরি: ২৫,৯১৬ ডলার
- উরুগুয়ে: ২৪,৩৮০ ডলার
- রোমানিয়া: ২২,৪৩৬ ডলার
- বুলগেরিয়া: ২০,৪২৬ ডলার
- পানামা: ১৯,৮০২ ডলার
- ওমান: ১৯,১১৯ ডলার
- কোস্টারিকা: ১৯,১০৪ ডলার
- রাশিয়া: ১৭,৪৪৬ ডলার
- চিলি: ১৭,১৮১ ডলার
- সার্বিয়া: ১৫,৩২২ ডলার
- কাজাখস্তান: ১৪,৭২৩ ডলার
- আর্জেন্টিনা: ১৪,৩৫৯ ডলার
- মেক্সিকো: ১৩,৯৬৭ ডলার
- মালয়েশিয়া: ১৩,৯০১ ডলার
- চীন: ১৩,৮০৬ ডলার
- মরিশাস: ১৩,০৯৯ ডলার
- ডোমিনিকান রিপাবলিক: ১১,৯১৯ ডলার
- আলবেনিয়া: ১১,১০৮ ডলার
- তুর্কমেনিস্তান: ১০,৮০১ ডলার
- ব্রাজিল: ১০,৫৭৮ ডলার
- উত্তর ম্যাসিডোনিয়া: ১০,৩৭৮ ডলার
- জর্জিয়া: ১০,১২৬ ডলার
- ডোমিনিকা — ৯,৯৪৪
- বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা — ৯,৬৪৮
- বেলারুশ — ৯,৪৩৫
- গ্যাবন — ৯,৩০৩
- পেরু — ৯,২৫৬
- আর্মেনিয়া — ৮,৯৬৯
- জামাইকা — ৮,৪০৫
- মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ — ৮,২৮৭
- কলম্বিয়া — ৮,২৪৯
- মলদোভা — ৮,২৩৯
- ইকুয়েটোরিয়াল গিনি — ৮,২২৯
- কসোভো — ৮,০৩৩
- থাইল্যান্ড — ৭,৯৪২
- বেলিজ — ৭,৮৯৭
- আজারবাইজান — ৭,৩৬৫
- ইকুয়েডর — ৭,২১০
- মঙ্গোলিয়া — ৭,০০৫
- বতসোয়ানা — ৬,৯৪৩
- লিবিয়া — ৬,৮৬৬
- সুরিনাম — ৬,৮৪৩
- ফিজি — ৬,৮২৫
- প্যারাগুয়ে — ৬,৭৯৯
- দক্ষিণ আফ্রিকা — ৬,৬৬৭
- গুয়াতেমালা — ৬,৪৭৮
- ইউক্রেন — ৬,৩৮২
- আলজেরিয়া — ৬,০৯৫
মোট ≈ ৯০টি দেশ/অঞ্চল যাদের GDP Per Capita ৬,০০০ ডলারের উপরে।
আমার মতে জিডিপি পার ক্যাপিটাল দশ হাজার ডলারের নিচের সব দেশে যাওয়া উচিত নয়, তারপরও আপনার যদি একান্তই যেতে হয় অন্তত ছয় হাজার ডলারের জিডিপি টার ক্যাপিটা থাকা দেশগুলোতে যান, এর নিচে যাওয়া যাবে যাওয়া যাবে না।
আপনাদের সুবিধার্থে এখানে আমি যেসব দেশের GDP Per Capita ছয় হাজার ডলার এর উপরে রয়েছে ও দশ হাজার ডলারের উপরে রয়েছে সবগুলোর তালিকা দিয়েছি।
আর দেখা গেল আপনি এযন সময় এমন দেশের জন্য আবেদন করছেন ওই সময় ওই দেশের কাজ ভালো হচ্ছে না, ভিসা ভালো দিচ্এছে না, রেশিও কম, সেক্ষেত্রে আপনার ভিসা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সময় সময় নষ্ট হবে।
আর একটা বিষয় হল সকল সময় ভিসা দেয় না। ভিসা দেয় আবার বন্ধ করে, আবার দেয় আবার বন্ধ করে, এখন সেটা মাথায় রেখে সেই দেশের জন্য চেষ্টা করতে হবে, কোন দেশ কোন কোন সময়ে ভিসা ইস্যু করতেছে ও কোন দেশের ভিসা হচ্ছে না এটা কিভাবে চেক করবেন নিজেরই যাই কিভাবে এই পরিসংখ্যানটা দেখবেন, এ বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করব ইনশাল্লাহ। বগুড়িয়ান এর সাথেই থাকুন।
–মোঃ মুন্না হোসেন, বগুড়া, বাংলাদেশ

